News before News

বাসা থেকে ভাষা শেখা

‘আরে মামু কইয়েন না! এমনিতেই চিপ্পা গলি, তার উপর রিকশাওয়ালাডি ফাউলের ফাউল। আব্বার নতুন গাড়ি, লাগায় দিসে…।’

এটি একটি আবাসনপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনচিত্রের সংলাপ। ঘটনাটা এমন—বাড়িতে অতিথি এসেছেন, ছেলেমেয়েকে মানুষ করতে মা-বাবা কত কী করছেন—এই নিয়ে আলাপ হচ্ছে। এমন সময় বাড়ির ছোট্ট সদস্য স্কুল থেকে বাসায় এল। অতিথি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী বাবু, কেমন আছ?’ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে এই সংলাপের অবতারণা। নেপথ্য কণ্ঠে বিজ্ঞাপনটিতে বলা হয়েছিল, ‘ওর আর কী দোষ? আশপাশে যা দেখবে, তাই তো শিখবে।’ কথাটা যে হেলাফেলার নয় সেটা বুঝলাম, যখন দেখলাম আমার পরিচিত এক শিশু এই বিজ্ঞাপন দেখে দেখেই সংলাপটা আত্মস্থ করে ফেলেছে। কথায় কথায় সে বলত, ‘আরে মামু কইয়েন না…!’

ছোটরা যা দেখে, তাই শেখে—এটা নতুন কোনো তথ্য নয়। একটি বাড়ির পরিবেশ অবধারিতভাবেই সেই বাড়ির শিশুর মনে ছায়া ফেলে; হোক সেটা গোচরে কিংবা অগোচরে। প্রয়াত লেখক, পরিচালক জহির রায়হানের ‘ছায়া’ আমরা খুঁজছিলাম তাঁর নাতনির মাঝে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে জহির রায়হান সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর চলচ্চিত্রে, গল্পে বারবার উঠে এসেছে ভাষার প্রতি ভালোবাসার কথা। সে জন্যই জহির রায়হানের ছেলে বিপুল রায়হান নিজের মেয়ের নাম রেখেছেন ভাষা রায়হান। দাদার মতো ভাষাও লেখেন। কবিতা লেখেন, গল্প লেখেন। ছোটবেলায় ইংরেজিমাধ্যম স্কুলে পড়েছেন। তবে বাংলা-ইংরেজি দুই ভাষাতেই তিনি প্রাঞ্জল।

লেখায়, কথা বলায় বাংলা ভাষার চর্চা শুরু হোক বাসা থেকে। পোশাক: ইনফিনিটিভাষা বলছিলেন, ‘যখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি, ছোট চাচা শার্লক হোমসের বই এনে দিয়েছিলেন। ইংরেজিটা নয় কিন্তু, বাংলা অনুবাদ। আমরা সব ভাইবোন ইংরেজিমাধ্যম স্কুলে পড়েছি, কিন্তু বাসায় ইংরেজি বলা আমাদের জন্য নিষিদ্ধই ছিল। বাবা-চাচা যত বই নিয়ে আসতেন, সব ছিল বাংলা।’

ছোটবেলা থেকে বাড়িভর্তি বই দেখে বড় হয়েছেন সংগীতশিল্পী সন্ধি। বলছিলেন, ‘বাবা (প্রয়াত সংগীত পরিচালক ও শিক্ষক খোদাবক্স শানু) বাণিজ্য মেলায় নিয়ে গিয়েছিলেন জীবনে একবার। সেবারই আমার প্রথম আর শেষ যাওয়া। কিন্তু বইমেলা কখনো বাদ যায়নি। দুই হাতভর্তি বই নিয়ে বাবার স্কুটিতে করে বাসায় ফিরতাম, সেই স্মৃতি এখনো স্পষ্ট মনে আছে।’

ছেলেমেয়েদের ভাষার প্রতি সন্ধির মা-বাবা খুবই সচেতন ছিলেন। মা ফরিদা ইয়াসমীনের বাড়ি বিক্রমপুরে। নিজের ভাইবোনদের সঙ্গে বিক্রমপুরের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বললেও সন্তানদের সঙ্গে তিনি সচেতনভাবেই প্রমিত বাংলায় কথা বলেন। সন্ধি নিজেও এখন বাবা হয়েছেন। তাঁর ছোট্ট মেয়ের নাম সংস্কৃতি। নাম শুনেই বোঝা যায়, মা-বাবার ছায়া সন্ধির ওপর পড়েছে। ‘ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে মানুষ যেভাবে কথা বলে, ‘ওলে বাবু, তুমি কি তকলেত খাবা?’ আমরা সংস্কৃতির সঙ্গে এভাবে কথা বলি না। স্পষ্ট বাংলায় বলি। ও সেভাবেই শিখছে। ওর মুখটা ছোট, আধো আধো বোলে ও হয়তো এখনো স্পষ্ট উচ্চারণ করতে পারে না। কিন্তু আমরা চেষ্টা করি ওকে প্রমিত বাংলা শেখাতে। ওকে গল্প বলি। গান শোনাই। ইংরেজি যে শেখাই না, তা নয়। কিন্তু ও আগে “গরু” বলা শেখে, তারপর শেখে “কাউ”,’ সন্ধি বলছিলেন।

নিয়মিত বাংলা বই পড়া ভাষার ওপর দখল আনবেদায়িত্ব শুধু বাসার নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও। ঢাকার ইংরেজিমাধ্যম স্কুল মাস্টারমাইন্ডের বাংলার শিক্ষক নাসিমা আক্তার জানালেন, বাংলা ভাষা শেখার, ভাষা সম্পর্কে জানার আগ্রহ তাঁদের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আছে। বলছিলেন, ‘আমি যখন ভাষা আন্দোলনের কথা বলি, আমরা যখন একুশে ফেব্রুয়ারিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করি, ছেলেমেয়েরা কিন্তু খুব আগ্রহ নিয়ে কথা শোনে।’

নাসিমা আক্তারের কথার সঙ্গে শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের কথার সুর খানিকটা মিলে গেল। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তির আকর্ষণের চেয়ে বইয়ের আকর্ষণটাই হবে বড়, যদি ছোট ছেলেমেয়েদের হাতে সময়মতো বইটা তুলে দেওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘এখন ঢাকায় কত সুন্দর সুন্দর পাঠাগার হয়েছে। মা-বাবারা যদি ছেলেমেয়েদের হাত ধরে সেখানে নিয়ে যান, তাদের বই পড়ে শোনান, সেটাই তাদের বেড়ে ওঠায় প্রভাব ফেলবে।’

বছর ঘুরে আসে ২১ ফেব্রুয়ারি। অনেকে আফসোসের সুরে বলেন, ‘কেবল একটা দিন ভাষার প্রতি ভালোবাসা দেখিয়ে কী লাভ?’ একটা লাভ নিশ্চয়ই অস্বীকার করা যাবে না। কাল ২১ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে নানা আয়োজন হবে। টেলিভিশনে, রেডিওতে বাজবে ‘আমি বাংলায় গান গাই’। তরুণদের টি-শার্টে চোখে পড়বে অ আ ক খ, মেয়েদের শাড়িতে প্রাধান্য পাবে সাদা আর কালো। হাতে ফুল নিয়ে দল বেঁধে তারা চলবে শহীদ মিনারের দিকে। এসব দেখে ছোট্ট একটা ছেলে হয়তো প্রশ্ন করে বসবে, ‘বাবা, ওরা সবাই কোথায় যাচ্ছে?’

‘শহীদ মিনারে।’

‘শহীদ মিনার কী বাবা?’

বাবা বলবেন, ‘সে অনেক দিন আগের কথা। ১৯৫২ সাল…’ এভাবেই পরবর্তী প্রজন্মের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে ২১ ফেব্রুয়ারি। বেঁচে থাকবে ভাষার জন্য ভালোবাসা।

আপনার এগুলো পছন্দ হতে পারে