News before News

মাতৃভাষা দিবসের ইতিহাস বিশ্ববাসী এখনো জানে না

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সঙ্গে একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের সম্পর্ক কী—বিশ্ববাসী তা এখনো ভালো করে জানে না। ১৮ বছর ধরে দিবসটি পালন হলেও এটি পালনকারী জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থার (ইউনেসকো) ওয়েবসাইটে দিবসটির পেছনের ইতিহাস এবং ভাষা আন্দোলনের শহীদদের অবদানের কোনো উল্লেখ নেই। জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে মাত্র একটি বাক্যে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে এটির যোগসূত্রের কথা বলা আছে।

দিবস চালুর পরপরই ২০০০ সালে এ-সংক্রান্ত তথ্য জানানোর জন্য বাংলাদেশ সরকারকে তাগিদ দিয়েছিল ইউনেসকো। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। জাতিসংঘকে এ বিষয়ে তথ্য সরবরাহের দায়িত্ব কার, এ বিষয়টিই স্পষ্ট হয়নি।

ইউনেসকোর ১৮৮টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের ভোটে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি লাভ করে। ২০০০ সাল থেকে জাতিসংঘের বিভিন্ন সদস্যরাষ্ট্র দিবসটি পালন করছে রফিক, সালাম, বরকতের আত্মদানের কথা না জেনেই।

প্রবাসে অভিজ্ঞতা
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পেছনে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের অবদানের ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী অজ্ঞতা অনেককেই পীড়া দেয়। বিশেষ করে বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশি বা যাঁরা পড়াশোনার সূত্রে বিদেশে পাড়ি জমান, তাঁরা এ নিয়ে বিস্মিত হন।

জার্মানিতে অধ্যয়নরত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শান্তা তাওহিদা সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর সহপাঠীদের কেউই এ দিবসের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়টি জানেন না। তিনি নিজ উদ্যোগে জাতিসংঘ এবং ইউনেসকোর সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ করে বিভিন্ন তথ্য পাঠিয়েছেন। ১৪ ফেব্রুয়ারি রাতে জাতিসংঘ ওয়েব টিম তাঁকে ই-মেইলে জানায়, জাতিসংঘের অফিশিয়াল ওয়েবপেজে কিছু তথ্য যোগ করা হয়েছে।

নতুন যোগ করা ওই তথ্যের বঙ্গানুবাদ করলে এর অর্থ দাঁড়ায়, ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন দিবসের সঙ্গে মিল রেখে নির্বাচন করা হয়েছিল, যেটি এই রেজল্যুশনের অন্যতম সহ-পৃষ্ঠপোষক। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০০২ সালের রেজল্যুশনে এই দিবসের ঘোষণাকে স্বাগত জানায়।

মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের দায় 
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতির ধারাবাহিকতায় ঢাকায় তৈরি করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। ২০০১ সালের ১৫ মার্চ জাতিসংঘের তখনকার মহাসচিব কফি আনানের উপস্থিতিতে সেগুনবাগিচায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০১০ সাল থেকে এটি কার্যক্রম শুরু করে। এমনকি মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইটেও এ-সংক্রান্ত তথ্য নেই।

এ ব্যাপারে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে দুই দফায় যোগাযোগ করা হয় মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক অধ্যাপক জীনাত ইমতিয়াজ আলীর সঙ্গে। প্রথমে তিনি উইকিপিডিয়ায় এ-সংক্রান্ত তথ্য থাকাই যথেষ্ট বলে উল্লেখ করেন। তবে গতকাল সোমবার আবার যোগাযোগ করা হলে দিবসটির ইতিহাস জানানোর ব্যাপারে এই ইনস্টিটিউটের দায়িত্ব স্বীকার করে বলেন, ‘অন্য দেশের মানুষও দিবসটির ইতিহাস খুঁজতে পারে, তা বুঝতে পারিনি। আগামী এক মাসের মধ্যে আমার প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে দিবসটির ধারাবাহিক ইতিহাস বাংলা এবং ইংরেজিতে দিয়ে দেব। এর বাইরে বাংলা ও ইংরেজিতে ইতিহাস-সংবলিত বই প্রকাশ করে ইউনেসকোর সদস্যরাষ্ট্রগুলোর কাছে পাঠিয়ে দেব। এ কাজটি চলতি অর্থবছরে সম্ভব না হলেও আগামী অর্থবছরের মধ্যে সম্পন্ন করব।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী করেছে
২০০০ সালের ১৪ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্বের ৪৮টি দেশে বাংলাদেশের ৬০টি দূতাবাস ও মিশনের দপ্তরগুলোতে কূটনৈতিক ব্যাগের মাধ্যমে কিছু পোস্টার পাঠানো হয়।

ব্রাজিলে মিশন উপপ্রধান এবং পরে চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের দায়িত্ব পালন শেষে সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন নাহিদা রহমান সুমনা। এর আগে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম সচিব, কানাডা এবং কলকাতায় বাংলাদেশ মিশনে কাউন্সিলরের দায়িত্ব পালন করেন। দেশের বাইরে প্রায় ১১ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের জন্য পোস্টার, লিফলেট পাঠানো হয় বিভিন্ন দূতাবাস এবং মিশনে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটসহ সমন্বিত উদ্যোগে কোনো কমিটি করা হলে ভাষা আন্দোলনকে তুলে ধরার সুযোগ বাড়বে।

গত বছর প্রথমবারের মতো জেনেভায় জাতিসংঘের সদর দপ্তরের সঙ্গে যৌথভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আনুষ্ঠানিকতা পালন করে জেনেভায় বাংলাদেশ দূতাবাস। এ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি এম শামীম আহসান। তিনি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার ইতিহাস তুলে ধরেন অনুষ্ঠানে।

তবে জাতিসংঘ বা ইউনেসকোর ওয়েবসাইটে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ইতিহাস না থাকা প্রসঙ্গে এম শামীম আহসান বলেন, ‘যেহেতু দিবসটি আন্তর্জাতিক দিবস, তাই জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে শুধু বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করলে বিরোধিতার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।’

ইউনেসকো কমিশন কী করেছে
বাংলাদেশ সরকার এবং ইউনেসকোর মধ্যে লিয়াজোঁ বা যোগাযোগের কাজ করে বাংলাদেশ ইউনেসকো জাতীয় কমিশন। এ কমিশনের সচিব মো. মনজুর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, দিবসটির ইতিহাসের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্জন মিশে আছে। এই ইতিহাস অবশ্যই জাতিসংঘ, ইউনেসকো এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে থাকা জরুরি।

১৫ ফেব্রুয়ারি এ ব্যাপারে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রতিবেদকের উপস্থিতিতেই ইউনেসকো ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান ব্যাটরিক কালদুনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে টেলিফোনে কথা বলেন। এরপর মনজুর হোসেন প্রথম আলোকে জানান, এবারের ২১ ফেব্রুয়ারির আগেই ইউনেসকো কমিশন এবং ইউনেসকো ঢাকার ওয়েবসাইটে দিবসটির ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এরপর ব্যাটরিক কালদুন প্রতিবেদককে ই-মেইল করেও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় দিবসটির ইতিহাস তুলে ধরার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেবেন বলে জানান।

আপনার এগুলো পছন্দ হতে পারে