News before News

খালেদা জিয়ার সামনে দীর্ঘ আইনি লড়াই

শুধু জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার জামিন নয়, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সামনে দীর্ঘ আইনি লড়াই মোকাবেলা করতে হবে। তার বিরুদ্ধে কুমিল্লায় নাশকতার মামলাসহ মোট পাঁচ মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। ইতিমধ্যে কুমিল্লার দুটি মামলায় হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। অন্য তিনটি মামলায় খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার দেখানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ। কুমিল্লার নাশকতার একটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা এরই মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাছে এসেছে।

গতকাল সোমবার ওই পরোয়ানায় খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার দেখানোর প্রায় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যে কোনো সময় বিএনপি চেয়ারপারসনকে নাশকতার মামলায় গ্রেফতার দেখানো হবে। কারাগার থেকে মুক্তি পেতে হলে খালেদা জিয়াকে সামনে বেশ কিছু মামলার আইনি লড়াই মোকাবেলা করতে হবে। এমন বাস্তবতায় খালেদা জিয়ার কারাবাস দীর্ঘ হতে পারে। এ ছাড়া নাশকতাসহ অন্যান্য মামলায় বিএনপির অন্য নেতাকর্মীদের গ্রেফতার অভিযানও চালাবে পুলিশ। তবে বিএনপির ‘শান্তিপূর্ণ’ কোনো কর্মসূচিতে বাধা দেবে না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সংশ্নিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এসব তথ্য জানায়।

এদিকে ২০০৮ সালের শাহবাগ ও তেজগাঁও থানায় দায়ের করা দুই মামলায় খালেদা জিয়াকে পৃথক দিনে আদালতে হাজির করতে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে গতকাল হাজিরা পরোয়ানা পাঠানো হয়েছে।

খালেদা জিয়ার কুমিল্লার দুটি মামলায় হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দেন। এই আদেশের বিরুদ্ধে সরকার পক্ষ কোনো আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে কি-না জানতে চাইলে গতকাল রাতে আইনমন্ত্রী  আনিসুল হক বলেন, এর ‘মেরিট’ আমরা খতিয়ে দেখছি। এরপর পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, কোনো মামলায় কারও একাধিক গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলে সবগুলো নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও বারের সেক্রেটারি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে খালেদা জিয়ার অন্য মামলাগুলো সামনে নিয়ে আসছে সরকার। তবে আইনি প্রক্রিয়া মোকাবেলা করে তাকে কারাগার থেকে বের করে আনা হবে।

কারাগারের ডিআইজি তৌহিদুল ইসলাম বলেন, আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি ও ৪ মার্চ খালেদা জিয়াকে পৃথক মামলায় আদালতে উপস্থিত করতে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে হাজিরা পরোয়ানা পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কুমিল্লায় নাশকতার ঘটনায় কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানার কাগজ তারা পাননি।

গুলশান থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিক সোমবার রাতে বলেন, খালেদা জিয়াকে কোনো মামলায় গ্রেফতার দেখানোর কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি।

পুলিশের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে নাশকতার ঘটনায় তিনটি মামলা করা হয়েছিল। অন্যদের সঙ্গে এ মামলায় খালেদা জিয়াসহ বিএনপির সাত শীর্ষ নেতা হুকুমের আসামি হ্নিছলেন। ২০১৭ ও গত বছরের জানুয়ারিতে খালেদা জিয়াসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে এ মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন কুমিল্লার আমলি আদালত। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ের পর নতুন রাজনৈতিক আবহের মধ্যে খালেদার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় পরোয়ানা ঢাকায় পাঠানো হয়। তবে গতকাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার ওই মামলায় গ্রেফতার দেখায়নি পুলিশ। গুলশান থানা এলাকায় বাসা হওয়ায় খালেদা জিয়ার পরোয়ানা ওই থানায় রয়েছে। এখন পরোয়ানা তামিলকারী পুলিশ কর্মকর্তা যে কোনো সময় সংশ্নিষ্ট আদালতকে অবহিত করবেন- ‘খালেদা জিয়া এরই মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তাই যাতে ওই মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়।’ খালেদা জিয়াকে কুমিল্লার মামলায় গ্রেফতার দেখানো হলে আদালত চাইলে তাকে কুমিল্লায় গিয়ে হাজিরা দিতে হতে পারে। আবার ঢাকার আদালত থেকেও তিনি জামিন আবেদন করতে পারেন।

কুমিল্লার ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মঞ্জুরুল আলম জানান, ২০১৫ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে গাড়িতে আগুন দিয়ে নাশকতার দুটি ঘটনায় তিনটি মামলা করা হয়েছিল। তিনটি মামলায়ই খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করা হয়। তিনটি মামলার চার্জশিটই এরই মধ্যে আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। খালেদা জিয়াসহ পলাতক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে। হত্যা মামলা ছাড়া বাকি দুটি মামলার কার্যক্রম উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে।

এরই মধ্যে এ মামলায় খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা তার আপিল ও জামিন আবেদনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে এখনও এ মামলায় রায়ের সার্টিফায়েড কপি খালেদার আইনজীবীরা পাননি। আইনের বিধান অনুযায়ী, খালেদা জিয়া যদি রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন তাহলে সার্টিফায়েড কপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যেই করতে হবে।

উচ্চপদস্থ একাধিক সূত্র জানায়, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে খালেদা জিয়াসহ বিএনপির যেসব নেতাকর্মীর নামে নাশকতার অভিযোগে মামলা হয়েছিল তার ফাইল নড়াচড়া শুরু হয়েছে। কোন মামলায় কারা জামিনে রয়েছেন, কারা এখনও গ্রেফতার হননি, তা খতিয়ে দেখছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এদিকে বিএনপি চেয়ারপাসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে দুর্নীতি, ভুয়া জন্মদিন, মানুষ হত্যা, নাশকতা, মানহানিসহ নানা অভিযোগে ৩৬টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে চারটি মামলা দুর্নীতির। তা হলো- গ্যাটকো দুর্নীতি, নাইকো, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতির মামলা। ৩৬টি মামলার মধ্যে চারটি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে, বাকি মামলা বর্তমান সরকারের আমলে করা হয়। খালেদা জিয়ার মামলার মধ্যে ১৯টি মামলা বিচারাধীন। এ ছাড়া তদন্তাধীন রয়েছে আরও ১২টি মামলা।

কুমিল্লার মামলায় আসামি ৭৮ : কুমিল্লার মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার, রফিকুল ইসলাম মিয়া, যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও সালাউদ্দিন আহমেদ, চৌদ্দগ্রামের জামায়াতের সাবেক সাংসদ সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহেরসহ ৭৮ জনের নামে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। খালেদা জিয়া মামলার ৫১ নম্বর আসামি।

আপনার এগুলো পছন্দ হতে পারে