News before News

নির্বাচন নিয়ে নীলনকশা

আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দল নানা ধরনের ছক কষছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়ার পর দেশের রাজনৈতিক চিত্র বদলে যেতে শুরু করেছে। ক্ষমতাসীন দল খালেদা জিয়াবিহীন একটি নির্বাচনের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। বিএনপি নেতারা অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন, যেকোনো পরিস্থিতিতে তারা আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। এক ধরনের নির্বাচনী প্রস্তুতিও বিএনপির রয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল থেকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের ওপর চাপ রয়েছে। ভারতও চায়, আগামী নির্বাচন যাতে অংশগ্রহণমূলক হয়। বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ থাকলে ক্ষমতাসীন দলের বিজয়ী হওয়া যে কঠিন হবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ একাধিক জরিপে সে ধরনের চিত্রই এসেছে।

এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের আগে বিএনপিকে দুর্বল করে ফেলা সরকারের প্রধান রাজনৈতিক কৌশল। এখন সভা-সমাবেশে বিধিনিষেধ, ধরপাকড় ও দমননীতি চালিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক তৎপরতা সীমিত করা গেলেও নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকবে। সুষ্ঠুু নির্বাচন দিতে হলে ন্যূনতম রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তখন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপিকে মোকাবেলা করা সরকারের জন্য দুরূহ হয়ে পড়বে। এ কারণে তাকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা কিংবা তিনি যাতে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে না পারেন- এ ধরনের ভাবনা ক্ষমতাসীনদের মধ্যে তীব্র হচ্ছে বলে মনে হয়। ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতা বলেছেন, খালেদা জিয়া ছাড়াও বিএনপি নির্বাচনে আসবে। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ১১ ফেব্রুয়ারি ভোলায় সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘দলীয় প্রধান (খালেদা জিয়া) যদি জেলেও থাকেন, তাকে ছাড়া নির্বাচন করতে অসুবিধা কোথায়? নির্বাচন করতে পারবে না কেন? নির্বাচন করবে ধানের শীষ আর নৌকা। আরেকটা হলো লাঙ্গল। জামায়াতে ইসলামী এখন নিষিদ্ধ। নিষিদ্ধ মানে নির্বাচন কমিশনে তাদের কোনো মার্কা নেই। সুতরাং জামায়াত থাকবে বিএনপির সাথে। সেই নির্বাচনে যেখানে থাকুন, বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, আমি যেখানেই থাকি না কেন আপনারা আপনাদের কাজ করে যাবেন। আগামী নির্বাচন হবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। এই সরকারই ক্ষমতায় থাকবে। তারা যদি চেষ্টা করে এই সরকারের অধীনে নির্বাচন করবে না- এটা তাদের ব্যাপার।’

একই ধরনের কথা বলেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের এক অনুষ্ঠানে বলেন, কাউকে নির্বাচনের বাইরে রেখে নির্বাচন করার ইচ্ছা সরকারের নেই। কিন্তু আইনের কারণে কেউ যদি নির্বাচনের বাইরে থাকে, সেখানে সরকারের কিছু করার নেই।’
সরকারের প্রভাবশালী দুই মন্ত্রীর এই বক্তব্যে তাদের আকাক্সক্ষার দিকটি সুপ্ত নয়, বরং খুবই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাদের এ বক্তব্যের নানা প্রতিফলন দৃশ্যমান হচ্ছে। এখন মনে হচ্ছে, খালেদা জিয়ার জামিন সহসাই হচ্ছে না। কারাগারে যাওয়ার পর এক সপ্তাহ না যেতেই তার নামে দায়ের করা একাধিক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
আসলে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য ‘খুব সহজ’ পথটি বেছে নিয়েছেন। খালেদা যদি নির্বাচনে অযোগ্য হন কিংবা নির্বাচনের সময় তিনি যদি কারাগারে থাকেন, তাহলে নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে বলে তারা আশা করছেন। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পনার বিপরীতে চলে যায়।

বাস্তবতা হচ্ছে, বেগম জিয়ার কারাদণ্ড আগামী নির্বাচনে বড় ইস্যু হতে যাচ্ছে। কারণ, শুরুতেই এ মামলার রায় নিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের ভুল রাজনৈতিক চাল এবং বিএনপির রাজনৈতিক কৌশলের কাছে সরকার এখন অনেকটা অসহায় হয়ে পড়ছে। খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের বাইরে রাখা কিংবা নির্বাচনের সময় জেলে রাখা পুরো নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক-পর্যায়ে এমন নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। এ ছাড়া বিএনপির নেতাকর্মীরা এখনকার চেয়ে আগামী দিনে আরো বেশি মরিয়া ও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়বেন। তখন খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করা হবে বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে কারামুক্ত করার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাপ আরো বাড়তে থাকবে। একই সাথে, খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা যে আরো বহু গুণ বাড়বে তাতে সন্দেহ নেই। ফলে, বেগম খালেদা জিয়ার গ্রেফতার বাংলাদেশের রাজনীতির একটি টার্নিং পয়েন্ট। খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে নির্বাচনের ছক উল্টে যেতে পারে। বরং খালেদা জিয়া বা জিয়া-পরিবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরো বেশি শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হতে পারেন।

সাধারণ মানুষের মনে শুরুতেই এ রায় নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা দায়ের করা হয়েছিল সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। এ মামলায় কোনো টাকা আত্মসাৎ করা হয়নি। অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ছিল। কিন্তু এ রায়ের আগে সরকারের একাধিক মন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, বেগম জিয়াকে কারাগারে যেতে হবে। তাই স্বাভাবিকভাবে মানুষের মধ্যে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে, রাজনৈতিক কারণেই তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে। রায়ের পর ক্ষমতাসীন দলের নেতারা যেভাবে উল্লাস প্রকাশ করেছেন, তাতে এ রায়ের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়ার মামলার রায় এমন এক সময় দেয়া হয়েছে যখন দেশে সরকারি ও বেসরকারি একাধিক ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে। এর সাথে ক্ষমতাসীন দলের এমপি, মন্ত্রী ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকেরা জড়িত। কিন্তু এ জন্য তাদের কাউকে কারাগারে যেতে হয়নি বা হচ্ছে না। কিন্তু সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্বামীর নামে প্রতিষ্ঠিত এতিমখানার দুই কোটি টাকা ব্যবহারের নিছক প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং তার ছেলেসহ অন্য আসামিদের ১০ বছরের কারাদণ্ড সাধারণ মানুষকে বিস্মিত করেছে। এর ফলে সরকারের এক ধরনের বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। এ ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চারটি মামলার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও ছয়টি মামলা দায়ের হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে আরো ৯টি মামলা ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সব মামলা আদালতে বাতিল করা হয়েছে; অপর দিকে বেগম জিয়ার মামলাগুলো চলেছে। নির্বাচনের বছরে রায় দেয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় এই মামলাগুলোর সাথে রাজনীতির নিবিড় সম্পর্কের দিকটি স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

বেগম খালেদা জিয়ার মামলার রায়কে কেন্দ্র করে বিএনপি এখন পর্যন্ত কৌশলী অবস্থান গ্রহণ করেছে। ক্ষমতাসীন দলের ধারণা ছিল, রায় ঘোষণার পর নেতাকর্মীরা রাজপথে সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়বে। এমন পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে বিএনপিকে কোণঠাসা করে ফেলা যাবে। কিন্তু বিএনপি এ রায়ের পর হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি দেয়নি। এমনকি, তাদের বিক্ষোভ মিছিল থেকে কোনো ধরনের ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। আবার রায়ের দিন পুলিশের কড়া নিরাপত্তা আর ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি সত্ত্বেও হাজার হাজার নেতাকর্মী রাস্তায় নেমে আসেন। দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবে খালেদা জিয়া আদালতে গেছেন।

এর আগে তিনি বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্যদের সাথে বৈঠক করেছেন। তারা মূলত তৃণমূল পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বের মূলশক্তি। এ ছাড়া মামলার রায়ের আগে খালেদা জিয়া একাধিকবার দলের স্থায়ী কমিটির সাথে বৈঠক করেছিলেন। প্রতিটি বৈঠকে তিনি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার এ আহ্বান সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হয়। রায়ের পর সহিংস কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি না হওয়ায় বিএনপি ও খালেদা জিয়ার যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ফুটে উঠেছে, এটি প্রশংসিত হয়েছে। এখন বিএনপির শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সরকারের দমননীতি সাধারণ মানুষকে বিএনপির প্রতি আরো বেশি সহানুভূতিশীল করে তুলতে পারে।

খালেদা জিয়াবিহীন বিএনপি ভাঙনের মুখে পড়তে পারে বলে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা যে আশা করছেন, তার কোনো বাস্তব ভিত্তি এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। বরং কারাগারে যাওয়ার আগে বেগম জিয়া যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ওয়ান-ইলেভেনের সময় মান্নান ভূঁইয়ার মতো কিছু বিএনপি নেতা আলাদা বিএনপি গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। সে দিকে ইঙ্গিত করে বেগম জিয়া নির্বাহী কমিটির বৈঠকে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, আগেরবার ক্ষমা করা হলে, কেউ যদি দল ভাঙার চেষ্টা করে, তাহলে ক্ষমা করা হবে না। আর তারেক জিয়ার সাথে দলের সিনিয়র নেতাদের দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে এমন কথাও বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে। কিন্তু বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেনÑ বেগম জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর দল আরো বেশি ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত রয়েছে। তিনি কারাগারে যাওয়ার দুই দিন পর ১০ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান ও উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং যুগ্ম সচিবদের সাথে এক বৈঠকে ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নিয়েছেন। এ বৈঠকে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে তিনি সিনিয়র নেতাদের ঐক্যবদ্ধভাবে দল পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেন। ফলে সিনিয়র নেতাদের সাথে তার আস্থার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বলে বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন।
এ ছাড়া বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রায় ১০ বছর ধরে যেভাবে মামলা ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তাতে দলে কেউ ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করলে সমর্থন তো দূরে থাক, বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতে পারে। ফলে এমন উদ্যোগ গ্রহণে কেউ সাহসী হবে না।

বিএনপি চেয়ারপারসন কারাগারে যাওয়ার পর ক্ষমতাসীন দল কতটা লাভবান হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে বলা যায়, গ্রেফতারের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্ষমতাসীনদের পক্ষে যায়নি। বেগম জিয়াকে কারাগারে নেয়ার পর তাকে কয়েকদিন ডিভিশন না দেয়া এবং নির্জন কারাগারে রাখার অভিযোগ নেতাকর্মীদের যেমন বিক্ষুব্ধ করেছে, তেমনি সাধারণ মানুষ তার ব্যাপারে আরো সহানুভূতি দেখাচ্ছে। তদুপরি, আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ওঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলো আবার সামনে চলে এসেছে। বিশেষ করে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের বিচার না হওয়ার বিষয়গুলো আলোচিত হওয়ায় ক্ষমতাসীন দলের নেতারা কোনো সদুত্তর দিতে পারছেন না। খালেদা জিয়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন তা আরো অধিক মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে জনমানসে। ফলে খালেদা কারারুদ্ধ হওয়ার পর ক্ষমতাসীন দলের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি যদি নিপীড়নমূলক পরিস্থিতির মধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে, তাহলে ক্ষমতাসীন দলের নীলনকশা বাস্তবায়ন করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।

উপসম্পাদকীয়,

আলফাজ আনাম।

আপনার এগুলো পছন্দ হতে পারে