News before News

পরিবর্তনের পথে বিএনপি

আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার টার্গেটসহ দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বিএনপি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মামলার রায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাগারে গেলেও হরতাল-অবরোধের মতো কোনো কঠোর কর্মসূচি না দেওয়ায় পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। রায়ের প্রতিবাদে শুধু আজ ও কাল বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচি দিয়েছে দলটি। এটি দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার সুস্পষ্ট ও ইতিবাচক মনোভাবের ইঙ্গিত। অবশ্য দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও দলের নির্বাহী কমিটির সভায় এবং সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে নেতাকর্মীদের শান্তিপূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তারা কোনো সংঘাতের রাজনীতি বিশ্বাস করেন না। এদিকে বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুসারে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানই এখন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। যদিও তিনিও দেশে নেই। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তিনিও ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি।

রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলছেন, আলোচিত দুর্নীতি মামলার রায়ে দৃঢ়ভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন দলটির নেতারা। একই সঙ্গে তারা বলেছেন, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিএনপি চেয়ারপারসনকে রাজনীতি ও নির্বাচনের বাইরে রাখার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এ রায় দেওয়া হয়েছে। মুখে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও হরতাল ডাকেননি তারা। বিএনপির এ আচরণে বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে স্পষ্টত পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই বিভিন্ন ঘটনার প্রতিবাদে হরতাল আহ্বান করে আসছে। ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনের এক বছরপূর্তিতে দেশব্যাপী অবরোধ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল, যাতে মানুষের জানমালের ক্ষতিসহ বিপুলসংখ্যক যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। এতে বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে নাশকতার মামলাও হয়েছিল।

রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদ সম্মেলনে দলের চেয়ারপারসনের সাজার প্রতিবাদে দু’দিনের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, গণতন্ত্রের সীমার মধ্যে যে কর্মসূচি আছে তারা সেগুলো পালন করবেন। তার এবং দলের যে কোনো পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, নেতাকর্মীদের রাস্তায় নেমে এসে শান্তিপূর্ণভাবে আইনের সীমায় থেকে আন্দোলনে নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্নেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমদ গতকাল বলেন, জনগণের ভোগান্তি ও দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমার কথা বিবেচনা করে বিএনপি হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি পরিহার করতে পারে। সংঘাত ও সংঘর্ষের রাজনীতি পরিহার করে নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক কর্মসূচি দেওয়া একটি ইতিবাচক দিক। অবশ্য পরিবর্তনের মূলে রয়েছে এ বছরের শেষে আগামী সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের আগে তারা সরকারকে আর কোনো সুযোগ দিতে চায় না। নির্বাচনের প্রস্তুতির আগ মুহূর্তে দলীয় নেতাকর্মীদের হয়তোবা আর ক্ষয়ক্ষতি করতে চায় না। অবশ্য এই পরিবর্তন কতদিন ধরে রাখবে, সেটাও দেখার বিষয়। তারপর আপাতত সহিংস কর্মসূচি পরিহার করাকে সাধুবাদ জানাতে হয়।

দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এখন তারেক রহমান :ক্রান্তিলগ্নে বিএনপির নেতৃত্ব দেবেন কে? গতকাল বৃহস্পতিবার চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পাঁচ বছর সাজা হওয়ায় এ নিয়ে দেশজুড়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অবশ্য দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে গঠনতন্ত্র অনুযায়ীই চলবে বিএনপি।’

দলের গঠনতন্ত্রের ৭(গ)(২)-এ ‘সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের কর্তব্য, ক্ষমতা ও দায়িত্ব’ উপধারায় বলা হয়েছে, ‘চেয়ারম্যানের সাময়িক অনুপস্থিতিতে তিনিই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসাবে চেয়ারম্যানের সমুদয় দায়িত্ব পালন করবেন।’ সে হিসেবে তারেক রহমানই এখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

বিএনপির প্রধান দুই ব্যক্তির একজন কারাগারে, অন্যজন বিদেশে অবস্থান করায় দল কীভাবে পরিচালিত হবে তা নিয়ে অনেক দিন ধরেই আলোচনা চলছে। গত কয়েকদিন দলের অভ্যন্তরে বিষয়টি আলোচনাও হয়েছে। দলটি বলছে, কীভাবে দল পরিচালিত হবে দলের চেয়ারপারসন তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সূত্র জানিয়েছে, ওই বৈঠকে খালেদা জিয়া তার অনুপস্থিতিতে তারেক রহমানের সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনা করেই স্থায়ী কমিটিকে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। প্রয়োজনে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সংশ্নিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ নেতা এবং দল সমর্থিত বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শ নেওয়ার কথাও বলেছেন খালেদা জিয়া।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা ও পরামর্শে দল চলবে। তিনি দলের দ্বিতীয় ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি। এ জন্য তারেকের দেশে ফেরার দরকার আছে কি-না জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম বলেন, না এ জন্য তার দেশে ফেরার দরকার নেই। ওখান থেকেই তিনি নির্দেশনা দিতে পারবেন।

প্রায় একই কথা বললেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদও।

সূত্র জানায়, বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান বর্তমানে বিপুলসংখ্যক মামলা মাথায় নিয়ে অসুস্থ অবস্থায় লন্ডনে চিকিৎসাধীন। সেখান থেকে বর্তমানেও নেপথ্যে দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার ভূমিকা থাকে। যদিও তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে হাইকোর্টের বিধিনিষেধ থাকায় তার বক্তব্য-বিবৃতি গণমাধ্যমে প্রচার বন্ধ রয়েছে। গতকালও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি একটি বিবৃতি দিয়েছেন।

বিএনপি নেতারা জানান, তারা আশা করছেন, খালেদা জিয়া শিগগিরই জামিনে মুক্তি পাবেন। এ কয়েকদিন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের পরামর্শ নিয়ে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিই দল পরিচালনা করবে। স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করবেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মাঠপর্যায়ে নির্দেশনাসহ সব কাজই মহাসচিব করবেন।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, দল চলবে দলের গঠনতন্ত্র অনুসারে। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান শূন্যস্থান পূরণ করেন। দলের গঠনতন্ত্রেও তা আছে। কিন্তু সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানও দেশে না থাকায় দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তে দল পরিচালিত হবে।

নির্বাচনী কৌশলে কী প্রভাব পড়বে? :জাতীয় নির্বাচনের আগে দলের চেয়ারপারসনকে কারাগারে পাঠানোর কী প্রভাব পড়বে বিএনপির নির্বাচনী কৌশলে? এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। কেউ বলছেন, দ্রুত তিনি জামিন পেয়ে যাবেন। নির্বাচন পর্যন্ত তিনি কারাগারে থাকবেন বলে মনে হয় না। আবার কেউ বলছেন, শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করতে পারবেন কি-না তাও বিবেচ্য বিষয়।

অবশ্য রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলছেন, বিএনপি অতীতেও এ ধরনের সংকটে পড়েছিল। দল ভাঙনের মুখে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এ রায়ে খুব বেশি অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়বে না বিএনপি। তাদের মতে, দলটি যথেষ্ট সময় পেয়েছে এ বিষয়ে পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়ার। বিএনপির জন্য এটি খুব বড় সংকট হলেও এটি কাটিয়ে উঠতে পারা উচিত বলে মনে করেন বিশ্নেষকরা।

রাজনৈতিক বিশ্নেষক ও সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, তারা আশা করেন, স্বচ্ছ এবং গণতান্ত্রিকভাবে বিএনপি পরিচালিত হবে। সে ক্ষেত্রে দলের চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতেও দল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেবে। অবশ্য যে দল গণতান্ত্রিক নয়, তার কাছ থেকে গণতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা কোনোভাবে আশা করা যায় না।

আপনার এগুলো পছন্দ হতে পারে