News before News

বিএনপির অগ্নিপরীক্ষা

গত ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলার রায় নিয়ে দেশের রাজনীতিতে সঙ্গত কারণেই যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, এর সবকিছুকে ভেদ করে খালেদা জিয়ার মামলার রায় এবং রায়-পরবর্তী তার নিজ দলের অবস্থান, এ বছরের শেষদিকে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির করণীয় ইত্যাকার বিষয়গুলো এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এই মামলার রায় এই মুহূর্তে শাসক দল আওয়ামী লীগ এবং প্রতিপক্ষ বিএনপির মধ্যকার রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি বড় ব্যবধানের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার দলের পক্ষ থেকে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় এটিকে সরকারের প্রতিহিংসা বলে আখ্যায়িত করা হলেও মামলা দায়ের থেকে শুরু করে বিচারিক কার্য শেষ করে রায় প্রদান পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে এখানে সরকারের পক্ষ থেকে কোনোভাবে এটিকে প্রভাবিত করার কোনো আলামত রয়েছে, তেমনটি পরিলক্ষিত হয়নি। যদি তা হতো, তবে এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সাড়ে নয় বছর সময় লাগার কথা ছিল না। উপরন্তু খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একাধিকবার আদালতে অনুপস্থিতির কারণে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হলেও সরকার নানা কৌশলে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেফতার থেকে বিরত থেকেছে। এখানে রায়-পরবর্তী পরিপ্রেক্ষিতে রায় বাস্তবায়ন করার দায়িত্বই কেবল পালন করেছে সরকার। এখানে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় কাজ করেছে তা হচ্ছে, এটি এমন একটি মামলা, যার স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার অতীত দুর্নীতির একটি খণ্ডিত চিত্র বের হয়ে আসার সুযোগ রয়েছে এবং সেই সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টাই কেবল সরকার করেছে। বলা চলে, ২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দায়েরকৃত মামলাটি দায়েরের পর ২০১৪ সালে এর অভিযোগ গঠনের পর থেকে রাজপথে বিএনপির অব্যাহতভাবে পড়ন্ত অবস্থান এই মামলার রায়-পরবর্তী আগামী বাংলাদেশের সম্ভাব্য কিছু চিত্রকল্প আমাদের সামনে দাঁড় করিয়েছে।

দুর্নীতি বিষয়টি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সর্বগ্রাসী এবং এক কথায় সব ক্ষেত্রেই এর বিচরণ রয়েছে। ইতিপূর্বে দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে এরশাদ এবং খন্দকার মোশতাক আহমদের বিচার ও দণ্ড হলেও খালেদা জিয়ার শাস্তি এ ক্ষেত্রে এ কারণে ব্যতিক্রম যে, তিনি নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে কোনো সরকারই দুর্নীতি তকমার ঊধ্বে না থাকলেও সত্যিকার একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে দুর্নীতির দায়ে কারাবরণ করতে হচ্ছে। তার দুর্নীতির বিষয়টি প্রমাণিত- এটি যেমন সন্দেহাতীত, তেমনি অস্বীকার করা যায় না যে, তার বিরুদ্ধে মামলাটির বিচারকার্য সম্পন্ন হয়ে তাকে আজকের এই পরিণতিতে নিয়ে এসেছে কিছু বিষয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনটি হচ্ছে- দলের বর্তমান বেহাল দশা, দল পরিচালনায় তার ব্যর্থতা এবং দলের অভ্যন্তরে দ্বৈত শাসন। সেই সঙ্গে এটাও অস্বীকার করা যায় না যে, এসব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে বিএনপি যদি রাজনৈতিক বড় ভুলগুলো না করত, হয়তো খালেদা জিয়ার আজকের এই দশা হতো না। এর মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় ভুল ছিল ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট করা। তাদের বোঝা উচিত ছিল যে, তাদের রাজনৈতিক দুর্বলতার কারণেই সেই সময় সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী করতে পেরেছিল, যার বিরুদ্ধে তারা ইতিবাচক রাজনীতির মধ্য দিয়ে কিছুই করতে পারেনি। সুতরাং সেই ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে তারা তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতার শতভাগ সরকারের সামনে উন্মোচন করে দিল।

এখানে যে বিষয়টি লক্ষণীয় তা হচ্ছে, খালেদা জিয়ার রায়-পরবর্তী সময় বিএনপি সত্যিই এক অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন। এই পরীক্ষা আজ দলের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সবার সামনে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্র নিয়ে উপস্থিত। খালেদা জিয়া তার দলকে সাংগঠনিকভাবে কতটুকু দৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছেন, এই প্রশ্ন তার অবর্তমানে দলীয় কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যেমন দৃশ্যমান হবে, তেমনি দলের সামনের সারির নেতৃবৃন্দ দলীয় প্রধানের মুক্তির লক্ষ্যে এবং দলের জনসমর্থন বাড়াতে কতটুকু বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে পারবেন, এটাও একটি বড় পরীক্ষা। সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে, দলের তৃণমূলের জন্য এবং তাদের জন্যও যারা সেদিন রায় শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন, তারা কীভাবে তাদের নেত্রীর প্রতি ভালোবাসার সত্যিকার বহিঃপ্রকাশ করতে পারবেন, তার ওপর। এখনও যারা বিষয়টিকে এমনভাবে দেখতে চেষ্টা করছেন যে, খুব দ্রুত খালেদা জিয়া এই মামলায় আপিলের মাধ্যমে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বের হয়ে যাবেন। তাদের মনে রাখতে হবে, কেবল স্বল্পমেয়াদি নয়, প্রয়োজনে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সংকটকালের জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে। এখানে দুর্নীতির মাধ্যমে মাত্র দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ নয়, বরং এতিমদের জন্য বিদেশি অর্থ আত্মসাতের বিষয়টিকে জনগণ নেতিবাচকভাবে দেখেছে, যা বিএনপি নিজেও অবগত। তাই এত বড় একটি দলের নেত্রী যখন নির্জন কারাবাসে রয়েছেন, তার মুক্তির জন্য জোরালো কোনো অবস্থান ঘোষণা করা যাচ্ছে না। রায়ের পর খালেদা জিয়ার প্রধান আইনজীবী এবং তার দলের একজন নেতা ব্যারিস্টার আবদুর রেজ্জাক খানকে প্রতিক্রিয়ায় বলতে শোনা গেল এই বলে যে, ৭৩ বছরের একজনকে শাস্তি দেওয়া ঠিক হয়নি। অথচ আসামি পক্ষের আইনজীবী হিসেবে তিনি জোর দিয়ে এ কথা বলতে পারলেন না, এই মামলাটি মিথ্যা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সুতরাং দলের ভেতরই যদি তার অপরাধ সন্দেহাতীত থাকে, এ ক্ষেত্রে দল তার আদর্শ ধরে কীভাবে এগোবে, এই প্রশ্ন থেকেই যায়।

খালেদা জিয়াকে যেদিন কারাগারে নিয়ে যাওয়া হলো, সে রাতেই দলের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে লন্ডনে অবস্থানরত অপর দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি তার পুত্র এবং দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। বলা হয়, তিনি সেখানে বসে দল চালাবেন। দুটি কারণে এটিকে আমরা নজিরবিহীন বলতে পারি- প্রথমত, যাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হলো তিনি নিজেও মানি লন্ডারিং মামলায় ৭ বছরসহ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১০ বছরসহ মোট ১৭ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত এবং আইনের চোখে একজন পলাতক আসামি; দ্বিতীয়ত, দলের চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি যে, স্বল্প সময়ের জন্য তারা দেশের বাইরে গেলেও দলের দায়িত্ব কাউকে দিয়ে যেতে। এখানে তারেক রহমান লন্ডনে বসে সিদ্ধান্ত দেবেন আর সেই সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব হয়ে তৃণমূলে বাস্তবায়িত হবে, এমন সস্তা রাজনীতি বোধ হয় এবার পরিহার করার সময় এসেছে বিএনপির। নিজে জেল খাটার ভয়ে ১০ বছর ধরে লন্ডনে বসে বিলাসী জীবনযাপন করবেন আর দলের নেতাকর্মীরা একের পর এক কারাবরণ করে যাবেন- এই ভাবনা কেউই মেনে নিতে পারেন না। যারা বাংলাদেশের লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে জানেন, তারা খুব ভালোভাবেই অবগত রয়েছেন যে, কেবল দেশের মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির অভিপ্রায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়গুলো কাটিয়েছেন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। অসংখ্যবার জেল-জুলুম সত্ত্বেও তিনি বারবার লড়ে গেছেন লক্ষ্য অর্জনের জন্য। আইয়ুব খানের শাসনামলের শুরুতে ১৯৫৮ সালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলায় দুই বছরের দণ্ড হলে পরে উচ্চ আদালত থেকে তিনি খালাসপ্রাপ্ত হন। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে ‘৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ‘৬৬-র ৬ দফা, ‘৬৮-৬৯-এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ‘৭০-এর নির্বাচন এবং ‘৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ- প্রতিটি ক্ষেত্রে সরব উপস্থিতি সত্ত্বেও রাজনীতির মঞ্চ থেকে তার করুণ বিদায়ে লাভবান হয়েছিল যে অপশক্তি, আজ দীর্ঘ দিবস-রজনী অতিক্রান্ত হওয়ার পরও একটি দুর্নীতি মামলার রায় বিএনপিকে যেমন অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন করেছে, একইভাবে সতর্কবার্তা রয়েছে দেশের রাজনীতির ক্ষেত্রেও।

সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; বর্তমানে বেইজিংয়ের ইউআইবিইতে পিএইচডিতে গবেষণারত।

ফরিদুল আলম।

আপনার এগুলো পছন্দ হতে পারে