বদলে যাওয়া নারায়ণগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরী বাংলাদেশের গর্ব

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার বিসিক শিল্প নগরী এলাকাটি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ সড়কের পাশেই। বহুদিনের পূর্বের অবস্থা বদলে একেবারেই রপ্তানিমূখী এ শিল্পনগরীটি এখন শুধু নারায়ণগঞ্জ নয় সারা বাংলাদেশের গর্ব হিসেবেই দিন দিন দেশের মাথা বহিঃবিশ্বে উঁচু করে যাচ্ছে।

দুই যুগ আগে দিনের বেলাতেও সাধারণ মানুষ যেতে ভয় পেত নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার শাসনগাওয়ে। দিনের বেলায় ডাকতো শিয়াল। তবে বর্তমানে প্রতিদিন কয়েক লাখ শ্রমিকের পদচারনায় মুখর হয়ে ওঠে গোটা শাসনগাও এলাকাটি। দুযুগ পূর্বে স্থাপিত বিসিক হোসিয়ারি শিল্পনগরীতে গড়ে উঠেছে সাত শতাধিক শিল্প কারখানা। কর্মসংস্থান হয়েছে সোয়া দুই লাখ শ্রমিকের। বিসিক শিল্পনগরীকে ঘিরে গড়ে ওঠা অসংখ্য কারখানাতেও কর্মরত রয়েছে লাখো শ্রমিক।জানা গেছে, ব্রিটিশ শাসনামলে পূর্ব বাংলার একমাত্র নদীবন্দর হিসেবে নারায়ণগঞ্জে পাট ব্যবসা কেন্দ্র ও পাটকল স্থাপন হয়। ১৯১৬ সালে শহরের টানবাজারে হংস হোসিয়ারী নামে নারায়ণগঞ্জে প্রথম হোসিয়ারী কারখানা স্থাপিত হয়। তারপর পিরামিড, প্যারামাউন্ট নামে আরও কয়েকটি হোসিয়ারী কারখানা গড়ে ওঠে। পূর্ব বাংলায় হোসিয়ারী পন্যের চরম ঘাটতির কারণে পঞ্চাশ দশকে নারায়ণগঞ্জে হোসিয়ারী শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। তৎকালীন সময়ে ভূ-গর্ভস্থ পানিতে আয়রন ও খনিজ পদার্থের ভাগ কম থাকা, স্থানীয় ঢাকেশ্বরী, লক্ষীনারায়ণ, চিত্তরঞ্জন কটন মিলসহ ইত্যাদি সুতার মিল নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত হওয়ায় এবং নারায়ণগঞ্জে প্রধান নদীবন্দর ও রেলযোগাযোগ ব্যবস্থা থাকায় নারায়ণগঞ্জে হোসিয়ারী শিল্প গড়ে ওঠে।

বাংলাদেশ হোসিয়ারী এসোসিয়েশনের তথ্যমতে, হোসিয়ারী শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় নারায়ণগঞ্জের হোসিয়ারি শিল্প ইউনিটকে কেন্দ্রীভূত করে পুনর্বাসন ও নতুন কারখানা স্থাপনে ১৯৮৫ সালে মনোটাইপ শিল্পনগর স্থাপনের পরিকল্পনা নেয় সরকার। পরে ১৯৯০ সালে বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ হোসিয়ারি এসোসিয়েশনের উদ্যোগে পঞ্চবটীর শাসনগাঁও এলাকায় ৫৮ দশমিক ৫২ একর জায়গার ওপর বিসিক হোসিয়ারি শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠা করা হয়। জমির মূল্য বাবদ অ্যাসোসিয়েশন দুই কোটি ৬৪ লাখ টাকা প্রদান করে। হোসিয়ারি শিল্পনগরের ৭১৪টি ইউনিটের মধ্যে পাঁচ কাঠার ১৮৬টি বড় প্লট এবং তিন কাঠার ৫২৮টি ছোট প্লট রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিল্পনগরের প্লটগুলো হোসিয়ারি মালিকদের মধ্যে বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো ধরনের ঋণ-সহায়তার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। যারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী ছিলেন তারা হোসিয়ারী ব্যবসার পাশাপাশি রফতানীমুখী নিট গার্মেন্টের কারখানা স্থাপন করেন। কেউ কেউ আবার নিটিং কিংবা প্রিন্টিং কারখানা স্থাপন করেন। ব্যবসায়ীদের একটা অংশ অর্থাভাবে সেখানে কারখানা স্থাপন করতে পারেনি। তাদের অনেকেই বরাদ্দ পাওয়া প্লট বিক্রি করে দেন। আর সেসব প্লটেই কালক্রমে গড়ে উঠে রফতানিমুখী নিট পোশাকের ছোট-বড় বিভিন্ন কারখানা। বাস্তবে এখানে ক্ষুদ্র হোসিয়ারি শিল্পের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।

বিকেএমইএর সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, নব্বইর দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রথম আমার বড় ভাই আব্দুস সালাম ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরী এলাকায় নেভী হোসিয়ারী এন্ড গার্মেন্ট সেখানে স্থানান্তর করেন। ওইসময় নেভী হোসিয়ারীতে ৫০০ থেকে ১০০০ শ্রমিক কাজ করতো। প্রথম দিকে শহর ছেড়ে বেশীরভাগ উদ্যোক্তারাই যেতে চাননি। কারণ ওইসময় সেখানে দিনের বেলাতেও বিসিক শিল্পনগরী এলাকায় শিয়াল ডাকতো। পরে ধীরে ধীরে সেখানে উদ্যোক্তারা আসতে থাকেন। বর্তমানে ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরী দেশের সবচেয়ে সফল শিল্পনগরী। এখান থেকে বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে। তবে শিল্পনগরীর রাস্তাঘাট বর্তমানে বেহাল অবস্থায় রয়েছে। রাস্তাঘাটে পানি জমে থাকায় শ্রমিকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এছাড়া দীর্ঘদিনেও ফায়ার স্টেশনটি চালু হয়নি। জুনে ফায়ার স্টেশনটি উদ্বোধন করার কথা থাকলেও সেটি কেন চালু হয়নি সেটি আমার বোধগম্য নয়।

ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরীর প্রশাসনিক কর্মকর্তা কামাল হোসেন জানান, ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরীর ৭১৪টি প্লটের সবগুলোতেই শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। নিট গার্মেন্টের পাশাপাশি এখানে নিটিং ও অন্যান্য কারখানা গড়ে উঠেছে। বিসিক হোসিয়ারী শিল্পনগরীতে সোয়া ২ লাখ শ্রমিক কর্মরত রয়েছে। মালিক সমিতির মাধ্যমে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া বিসিককে ঘিরে আরো অসংখ্য কারখানা গড়ে উঠেছে। সেখানেও অগণিত শ্রমিক কাজ করছে।

তিনি আরো জানান, ফতুল্লার বিসিক হোসিয়ারী শিল্পনগরীটি যেখানে অবস্থিত সেখানে একসময় বন ছিল। যখন শিল্পনগরীটি স্থাপিত হয় তখন ভয়ে অনেক কারখানা মালিক কারখানা স্থাপন করতে আসতে চাইতো না। তাদেরকে তখন ডেকে ডেকে আনতে হয়েছিল।
আপনার এগুলো পছন্দ হতে পারে